কক্সবাজার-চট্টগ্রাম সড়ক যেনো মৃত্যুফাঁদ

মো. আবদুল হালিম, কক্সবাজার প্রকাশিত: এপ্রিল ৪, ২০২৫, ০৫:১০ পিএম
কক্সবাজার-চট্টগ্রাম সড়ক যেনো মৃত্যুফাঁদ

কক্সবাজার-চট্টগ্রাম মহাসড়ক এখন যেনো মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে। পর্যটন রাজধানী কক্সবাজারের সাথে সংযুক্ত এই ব্যস্ততম সড়কটিতে একের পর এক ভয়াবহ ও মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারাচ্ছেন এবং পঙ্গুত্ববরণ করছেন পর্যটকসহ সাধারণ মানুষ। ঈদযাত্রার প্রথম চার দিনে কক্সবাজার-চট্টগ্রাম মহাসড়কে ৮টি দুর্ঘটনায় ১৫ জন নিহত এবং শতাধিক মানুষ আহত হয়েছে।

চুনতির জাঙ্গালিয়া ট্রাজেডির রেশ না কাটতেই, ৩ এপ্রিল রাতে কক্সবাজারের ব্যস্ততম ডলফিন মোড়ে ব্রেক ফেল করা তিশা পরিবহনের বাসের চাপায় ৫ জন আহত হন। দুর্ঘটনায় দুমড়ে-মুচড়ে যায় সিএনজি ও অটোরিকশা। ওই দিন সকালে মালুমঘাট রিংভং, চকরিয়া এবং নাপিতখালীতে পৃথক দুর্ঘটনায় পর্যটকবাহী বাস উল্টে অন্তত ৪০ জন আহত হন।

চকরিয়ার পার্শ্ববর্তী পর্যটন স্পট লামার মিরিঞ্জার কাছে বাস উল্টে শিশুসহ ২৫ জন গুরুতর আহত হন। একের পর এক দুর্ঘটনায় দেশের সচেতন মহল উদ্বেগ প্রকাশ করছে।

এর আগে, ঈদযাত্রায় গত তিন দিনে চট্টগ্রাম মহাসড়কের লোহাগাড়া জাঙ্গালিয়া ঢালা নামক স্থানে দুর্ঘটনায় নারী-শিশুসহ ১৫ জন নিহত হন এবং পৃথক ঘটনায় অন্তত ৩০ জন আহত হন। টানা দুর্ঘটনায় মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘ হওয়ায় কক্সবাজার-চট্টগ্রাম মহাসড়ক চার লেনে উন্নীত করার দাবি আরও জোরালো হয়েছে। বৃহস্পতিবার (৩ এপ্রিল) দুপুরে মরণফাঁদ থেকে বাঁচতে জনদাবি নিয়ে সর্বস্তরের মানুষ মানববন্ধন, বিক্ষোভ ও সভা-সমাবেশ করেছে।

এদিকে, কক্সবাজার সড়ক ও জনপদ অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী রুকন উদ্দিন খালেদ চৌধুরী জানিয়েছেন, জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা) এর অর্থায়নে ১৪৮ কিলোমিটার চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজ চলছে। আগামী সেপ্টেম্বরের মধ্যে এই কাজ শেষ হলে প্রকল্প প্রস্তুত করে দরপত্র আহ্বান করা হবে। তার মতে, আগামী ২০২৬ সালের মাঝামাঝি সময়ে চার লেন সড়ক উন্নীত করার কাজ শুরু হতে পারে।

প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক দেশের ব্যস্ততম মহাসড়কের একটি। এর বেশির ভাগ অংশের প্রশস্ততা মাত্র ১৮-৩৪ ফুট। ফলে দূরপাল্লার গাড়ি স্বাভাবিক গতিতে চলতে পারে না। ১৪৮ কিলোমিটার পথ বাসে যেতে সময় লাগে ৫ থেকে সাড়ে ৫ ঘণ্টা। অতিরিক্ত বাঁক, উপসড়ক থেকে যত্রতত্র ছোট-বড় গাড়ি মহাসড়কে উঠে আসার কারণে সড়কটি হয়ে উঠেছে ভয়াবহ দুর্ঘটনা প্রবণ। এর সাথে যুক্ত হয়েছে পলিথিন বিহীন ট্রাক ভর্তি লবণ পরিবহন, যা সীমান্ত উপজেলা টেকনাফ, উখিয়া ও কক্সবাজার সদর থেকে আসছে। এই লবণের কারণে রাতের কুয়াশার সাথে সড়কটি মারাত্মক পিচ্ছিল হয়ে পড়ে, যা দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।

স্থানীয় বাসিন্দা সাইফুল ইসলাম বলেন, "চট্টগ্রাম-কক্সবাজার সড়কটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গত ২০ বছরেও এ সড়ক প্রশস্ত করা হয়নি। সরু এই সড়কে কয়েকটি বিপজ্জনক বাঁক রয়েছে। যদি সড়কটি চার লেন বা ছয় লেন করা হতো, তবে এ ধরনের দুর্ঘটনা ঘটে নি। অথচ সরকার এ সড়কের উন্নয়নে এগিয়ে আসছে না।"

এদিকে, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের অত্যাধিক ঝুঁকিপূর্ণ অংশগুলো চিহ্নিত করা হয়েছে, বিশেষ করে মহাসড়কের হাশমতের দোকান, ঠাকুরদীঘি, পদুয়া, লোহাগাড়া শহর, আধুনগর, হাজি রাস্তা, চুনতি, জাঙ্গালিয়া এলাকা, চকরিয়া অংশের ইসলাম নগর, ইমাম বুখারী মাদ্রাসা এলাকা, বানিয়ারছড়া, ওরি আমগাছ তলা, হারবাং লালব্রীজ, আজিজ নগর, চকরিয়া বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ এলাকা, লক্ষ্যারচর জিদ্দা বাজার, মালুমঘাট, ছগিরশাহকাটা, ডুলাহাজারা, খুটাখালী, রামু, ঝিলংজা, মুক্তারকুল ও কক্সবাজার শহরের প্রবেশদ্বার খ্যাত ডলফিন মোড়।

লোহাগাড়া ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের টিম লিডার রাখাল চন্দ্র রুদ্র জানান, ঈদের ছুটিতে তিন দিনে মহাসড়কের এই অংশে তিনটি দুর্ঘটনা ঘটেছে। দুর্ঘটনার জন্য বেশ কিছু কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে, যেমন: লবণপানি সড়কে পড়ে পিচ্ছিল হওয়া, বিপজ্জনক বাঁক, এবং অন্য জেলার চালকদের এ সড়কে গাড়ি চালানোর অভিজ্ঞতার অভাব।

এ ছাড়া, সড়ক দুর্ঘটনা রোধে করণীয় সম্পর্কে জানতে চাইলে মালুমঘাট হাইওয়ে পুলিশ ফাঁড়ির ওসি মেহেদী হাসান জানান, চালক যদি স্পিডে গাড়ি চালান, তবে মামলা দেয়া হবে। বৃহস্পতিবার নির্দেশ অমান্য করে গাড়ি চালানোয় ৭টি মামলা করা হয়েছে। তাছাড়া, লবণ পরিবহনের সময় নির্গত পানি সড়কটিকে পিচ্ছিল করে তুলছে, যা দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।

ইএইচ