ব্যাংককে ইউনূস-মোদির ৪০ মিনিটের বৈঠক

হাসিনার প্রত্যর্পণ চাইল বাংলাদেশ

আমার সংবাদ ডেস্ক প্রকাশিত: এপ্রিল ৫, ২০২৫, ১২:১১ এএম
হাসিনার প্রত্যর্পণ চাইল বাংলাদেশ
  • সীমান্ত হত্যা ঠেকাতে মোদিকে আহ্বান

  • ‘সম্পর্ক খারাপ হয়’ এমন বক্তব্য এড়িয়ে চলার আহ্বান মোদির

বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির মধ্যে গতকাল শুক্রবার ব্যাংককে দ্বিপাক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে।

প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম জানান, গত এক দশকে এ দুই নেতার মধ্যে প্রথম আনুষ্ঠানিক বৈঠকটি ৪০ মিনিট স্থায়ী হয়। দুই দেশের এ দুই গুরুত্বপূর্ণ নেতা পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও খোলামেলা আলোচনার মনোভাব নিয়ে একে অপরকে অভ্যর্থনা জানান। বৈঠকটি খোলামেলা, ফলপ্রসূ ও গঠনমূলক ছিল বলে তিনি জানান।

বৈঠকের বরাত দিয়ে শফিকুল আলম জানান, বৈঠকে অধ্যাপক ইউনূস বলেন, বাংলাদেশ ভারতের সঙ্গে সম্পর্ককে গভীরভাবে মূল্যায়ন করে। আমাদের বন্ধুত্বের শিকড় ইতিহাস, ভৌগোলিক সান্নিধ্য ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে গভীরভাবে প্রোথিত। ১৯৭১ সালের আমাদের সবচেয়ে কঠিন সময়ে ভারতের সরকার ও জনগণের অটুট সহায়তার জন্য আমরা চিরকৃতজ্ঞ।

যদিও এটি দুই শীর্ষ নেতার মধ্যে প্রথম সরাসরি বৈঠক, অধ্যাপক ইউনূস বলেন, গত আট মাসে দুই দেশের মধ্যে বেশ কয়েকটি দ্বিপাক্ষীয় যোগাযোগ হয়েছে।

দ্বিপাক্ষীয় সম্পর্কের চ্যালেঞ্জ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমরা চাই আমাদের দুই দেশের জনগণের কল্যাণে সম্পর্ককে সঠিক পথে নিয়ে যেতে, আপনার সঙ্গে একসঙ্গে কাজ করতে। বিমসটেকের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর অধ্যাপক ইউনূস সংগঠনের সাত সদস্য দেশের মধ্যে একটি মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য ভারতের সমর্থন কামনা করেন। তিনি গঙ্গা পানি চুক্তি নবায়ন ও তিস্তা নদীর পানিবণ্টন চুক্তি সম্পন্ন করার আহ্বান জানান। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি অধ্যাপক ইউনূসকে বিমসটেকের নেতৃত্ব গ্রহণের জন্য অভিনন্দন জানান এবং ঈদুল ফিতরের শুভেচ্ছা জানান।

তিনি বলেন, ঢাকার সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পায়। আমাদের সম্পর্কের ইতিহাস বাংলাদেশের জন্মলগ্ন থেকে শুরু হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী মোদি অধ্যাপক ইউনূসের আন্তর্জাতিক খ্যাতির কথা স্মরণ করে বলেন, ভারত সর্বদা একটি প্রগতিশীল, গণতান্ত্রিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশকে সমর্থন করবে।

তিনি আরও বলেন, ভারত বাংলাদেশের কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের পক্ষে নয়, আমাদের সম্পর্ক মানুষে-মানুষে। অধ্যাপক ইউনূস বাংলাদেশের পক্ষ থেকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ বিষয়ে ভারত সরকারের কাছে যে আবেদন রয়েছে, এর অগ্রগতির খোঁজ নেন। তিনি অভিযোগ করেন, শেখ হাসিনা ভারত সরকারের আতিথেয়তা গ্রহণ করে বিভিন্ন মিডিয়াতে উস্কানিমূলক বক্তব্য দিচ্ছেন এবং বাংলাদেশে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির চেষ্টা করছেন।

তিনি বলেন, তিনি অন্তর্বর্তী সরকারের বিরুদ্ধে মিথ্যা ও উস্কানিমূলক বক্তব্য দিয়ে চলেছেন। আমরা আশা করি, ভারত সরকার তাকে এমন মন্তব্য থেকে বিরত রাখার যথাযথ ব্যবস্থা নেবে।

অধ্যাপক ইউনূস জাতিসংঘের মানবাধিকার হাইকমিশনের (ওএইচসিএইচআর) একটি অনুসন্ধান প্রতিবেদনের কথা উল্লেখ করেন, যাতে ২০২৪ সালের ১৫ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত নিরাপত্তা বাহিনী ও সশস্ত্র আওয়ামী লীগ কর্মীদের দ্বারা সংঘটিত গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিক্ষোভে প্রায় ১ হাজার ৪০০ জন নিহত হন, যাদের মধ্যে প্রায় ১৩ শতাংশ শিশু। প্রতিবেদনে এও বলা হয়, প্রতিবাদ দমন করতে হত্যা, নির্যাতন ও অমানবিক আচরণের মতো মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত হয়েছে বলে যথেষ্ট ভিত্তি রয়েছে।

প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে, সেই সময়কার প্রধানমন্ত্রী নিজে নিরাপত্তা বাহিনীকে বিক্ষোভকারীদের হত্যা ও তাদের লাশ গুম করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। শেখ হাসিনার বক্তব্যকে ঘিরে যে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী মোদি তার জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে দায়ী করেন। তিনি বলেন, ভারতের সম্পর্ক কোনো ব্যক্তি বা দলের সঙ্গে নয়, একটি দেশের সঙ্গে। অধ্যাপক ইউনূস সীমান্ত হত্যা প্রসঙ্গেও উদ্বেগ প্রকাশ করেন এবং বলেন, এ ধরনের ঘটনা বন্ধে যৌথভাবে কাজ করা হলে তা শুধু অনেক পরিবারকে কষ্ট থেকে রক্ষা করবে না, বরং দুই দেশের মধ্যে আস্থা ও সম্পর্ক আরও দৃঢ় হবে।

তিনি বলেন, প্রতিবার সীমান্তে এ ধরনের হত্যাকাণ্ড ঘটলে আমার মন কাঁদে, এবং ভারতকে অনুরোধ করেন এসব বন্ধে কার্যকর উপায় খুঁজে বের করতে। প্রধানমন্ত্রী মোদি জানান, ভারতীয় সীমান্তরক্ষীরা কেবল আত্মরক্ষার্থেই গুলি চালায় এবং প্রাণহানির ঘটনাগুলো ভারতের ভূখণ্ডেই ঘটে। উভয় নেতা এ বিষয়ে একসঙ্গে কাজ করার প্রয়োজনীয়তা ব্যক্ত করেন। বিমসটেকের চেয়ারম্যান হিসেবে অধ্যাপক ইউনূস আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, তার নেতৃত্বে এই সংস্থাটি আরও কার্যকর ও প্রাণবন্ত হয়ে উঠবে এবং বিশ্ব বাণিজ্যের সঙ্গে সংযুক্ত হতে সদস্য দেশগুলোর জন্য একটি কার্যকর রপ্তানি-আমদানি রুট হিসেবে বিমসটেক গড়ে উঠবে। বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী মোদির উদ্বেগের জবাবে অধ্যাপক ইউনূস বলেন, এসব রিপোর্ট অতিরঞ্জিত এবং অধিকাংশই মিথ্যা। তিনি ভারতীয় সাংবাদিকদের বাংলাদেশে এসে নিজেরাই তদন্ত করার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ধর্মীয় ও লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার প্রতিটি ঘটনার উপর একটি কার্যকর নজরদারি ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে এবং সরকার দৃঢ় পদক্ষেপ নিচ্ছে। দুই নেতা একে অপরের সুস্বাস্থ্য কামনা করেন এবং দুই দেশের মানুষের শান্তি, অগ্রগতি ও সমৃদ্ধির জন্য শুভেচ্ছা বিনিময় করেন।

বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন, প্রধান উপদেষ্টার উচ্চ প্রতিনিধি ড. খলিলুর রহমান, ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর, জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল প্রমুখ।

মোদিকে স্মৃতিময় ছবি উপহার ড. ইউনূসের

অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব নেয়ার পর ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে প্রথম বৈঠকে এক দশক আগের স্মৃতিময় এক ছবি তাকে উপহার দিয়েছেন বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস।

গতকাল শুক্রবার দুপুরে ব্যাংককের সাংরিলা হোটেলে ষষ্ঠ বিমসটেক শীর্ষ সম্মেলনের ফাঁকে দুই প্রতিবেশী দেশের সরকারপ্রধানের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক হয়। বৈঠক শেষে ২০১৫ সালের ওই আলোকচিত্র মোদিকে উপহার দেন ইউনূস।

প্রধান উপদেষ্টার উপপ্রেস সচিব আবুল কালাম আজাদ মজুমদার বলেন, ২০১৫ সালের ৩ জানুয়ারি মুম্বাইয়ে ১০২তম ভারতীয় বিজ্ঞান কংগ্রেসে নোবেল বিজয়ী অধ্যাপক ইউনূসকে স্বর্ণপদক পরিয়ে দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। সেই ছবিই ১০ বছর পর মোদিকে উপহার দিলেন বাংলাদেশের আজকের সরকারপ্রধান ইউনূস। এমন এক সময়ে ইউনূস ১০ বছর আগের সেই স্মৃতি মোদিকে মনে করিয়ে দিলেন, যখন দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে নানা কারণে টানাপোড়েন চলছে। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট ক্ষমতাচ্যুত হন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সেদিনই তিনি ভারতে চলে যান। তিন দিন পর সরকার পরিচালনার দায়িত্ব নেয় মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার। ‘গণহত্যা’, ‘গুম’সহ তিন মামলায় শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় তাকে ফেরত পাঠানোর অনুরোধ জানিয়ে সরকার ভারতকে আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠালেও দিল্লি তার উত্তর দেয়নি। শেখ হাসিনা দেশ ছাড়ার পর থেকেই বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্কে এক ধরনের অস্বস্তি চলছে। দিল্লিতে বসে তিনি বাংলাদেশে ‘অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির চেষ্টা’ করছেন বলে অভিযোগ করে আসছে ইউনূস সরকার।

অপরদিকে বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তার বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে এক্ষেত্রে পদক্ষেপ নেয়ার দাবি জানিয়ে আসছে ভারত সরকার। পাশাপাশি ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলো বিরুদ্ধে ‘মিথ্যা ও অপতথ্য’ এবং ‘অতিরঞ্জিত প্রচারণার’ অভিযোগ বাংলাদেশ সরকার করেছে। বিভিন্ন বিষয়ে পাল্টাপাল্টি বিবৃতি দেয়ার পাশাপাশি সীমান্ত ইস্যু এবং শেখ হাসিনার বক্তব্য ঘিরে পাল্টাপাল্টি কূটনীতিক তলবের ঘটনাও ঘটেছে। ইউনূস দায়িত্ব নেয়ার পর দুই দফা মোদির সঙ্গে দেখা হওয়ার সুযোগ তৈরি হলেও তা হয়ে ওঠেনি। ফলে বিমসটেকের সম্মেলনে তাদের বৈঠক হবে কি না, তা নিয়ে আলোচনা চলছিল।

প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম বলেন, দুই সরকার প্রধানের মধ্যে বৈঠকটি ‘অত্যন্ত গঠনমূলক ও ফলপ্রসূ’ হয়েছে। পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট সব বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। ‘শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ এবং ভারতে বসে তিনি উসকানিমূলক বক্তব্য দিচ্ছেন, এসব বিষয় বৈঠকে তুলে ধরা হয়েছে। এ ছাড়া সীমান্তে হত্যা, তিস্তা নদীর পানি বণ্টনসহ পারস্পরিক স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে।’