ফেব্রুয়ারি ২৮, ২০২৫, ১২:১৯ এএম
নতুন রাজনৈতিক দলকে স্বাগত বিএনপির, গ্রহণ-বর্জনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানাবে জনগণ
প্রতিহিংসা, প্রতিশোধ নয় ভালোবাসায় বাসযোগ্য উন্নত রাষ্ট্র গড়ার আহ্বান খালেদা জিয়ার
জাতীয় নির্বাচনের আগে স্থানীয় সরকার নির্বাচন থেকে সরে আসার আহ্বান তারেক রহমানের
দীর্ঘদিন পর এক ছাদের নিচে মিলিত হওয়ার সুযোগ পেয়েছেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) নেতারা। দলটির সব অঙ্গ সংগঠনের শীর্ষনেতা জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য, জাতীয় নির্বাহী কমিটির সব সদস্য এবং জাতীয় নির্বাচনের জন্য তিনশ’ আসনের প্রাথমিকভাবে মনোনীত সম্ভাব্য প্রার্থীরা
গতকাল একত্রিত হয়েছেন জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় অনুষ্ঠিত বর্ধিত সভায়। বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার ও দলটির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ভার্চুয়ালি অংশ নেন।
সভায় দলটির শীর্ষ নেতারা ঐক্য অটুট রাখার পক্ষে জোরালো বক্তব্য দেন।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেন, হাজারও শহীদের আত্মত্যাগের মধ্যে দিয়ে স্বাধীনতাপ্রিয় বীর জনতার রক্তক্ষয়ী গণঅভুত্থানে ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে পালানোর পর দেশে গণতন্ত্রকামী মানুষের সামনে বাংলাদেশ পুনর্গঠনের এক অপার সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত হয়েছে। এই সুযোগ এবং সম্ভাবনা নস্যাৎ করার জন্য এরই মধ্যে নানা রকম ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছে। সুকৌশলে রক্ত পিচ্ছিল রাজপথে গড়ে ওঠা ‘জাতীয় ঐক্য’ এবং জাতীয় নির্বাচনের পরিবেশ বিনষ্টের অপচেষ্টা চলছে। ষড়যন্ত্রকারীরা যাতে সফল হতে না পারেন সেজন্য সবাইকে সতর্ক থাকতে বলেছেন তিনি।
সভায় বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া বলেছেন, চিকিৎসার জন্য যুক্তরাজ্য থাকলেও জনগণের পাশে আছি। আমার অবর্তমানে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান, সিনিয়র নেতারা আপনাদের সবাইকে সঙ্গে নিয়ে নিরন্তর কাজ করে দলকে সুসংহত করেছেন। দলীয় নেতাকর্মীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, আমি বিশ্বাস করি আপনারা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের আদর্শে আরও উজ্জীবিত হয়ে আগামী নির্বাচনে সাফল্যের জন্য ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করবেন। এমন কোনো কাজ করবেন না যাতে আমাদের এতদিনকার সংগ্রাম, আত্মত্যাগ বিফলে যায়। আমাদের সব সময় শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সেই উক্তি মনে রাখা দরকার- ব্যক্তির চেয়ে দল বড়, দলের চেয়ে দেশ বড়।
গতকাল বিএনপির বর্ধিত সভায় লন্ডন থেকে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে এসব কথা বলেন তিনি। সভায় ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলন নিহত সব শহীদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন খালেদা জিয়া।
খালেদা জিয়া বলেন, দীর্ঘ ৬ বছর পর আপনারা আবারও ফ্যাসিস্ট মুক্ত বাংলাদেশে একত্রিত হতে পেরেছেন। আল্লাহর কাছে হাজার শুকরিয়া আদায় করছি। দীর্ঘ ফ্যাসিবাদের আন্দোলনে যারা শহীদ হয়েছেন এবং সম্প্রতি জুলাই-আগস্ট আন্দোলনে শাসকদের নির্মম দমন-নিপীড়নের কারণে গণহত্যায় শহীদ হয়েছেন তাদের প্রতি আমি শ্রদ্ধা জানাচ্ছি। আহতদের প্রতি জানাচ্ছি আন্তরিক সমবেদনা।
চিকিৎসার কারণে যুক্তরাজ্যে থাকলে আমি সব সময় আপনাদের সঙ্গে আছি উল্লেখ করে খালেদ জিয়া বলেন, দীর্ঘ ১৫ বছর যারা গণতন্ত্রের জন্য ও আমার মুক্তির জন্য আমাদের অসংখ্য সহকর্মী প্রাণ দিয়েছেন, জুলুম-নির্যাতনের শিকার হয়েছেন এবং প্রায় সোয়া লক্ষ্য মিথ্যা মামলায় জর্জরিত হয়ে এখনো আদালতের বারান্দায় ন্যায় বিচারের জন্য ঘুরে বেড়াচ্ছেন, আপনাদের এ ত্যাগ শুধু দল নয়, জাতি চিরকাল স্মরণে রাখবে।
দেশ আজ এক সংকটময় সময় অতিক্রম করছে বলে উল্লেখ করে সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী বলেন, আপনাদের এবং ছাত্রদের সমন্বিত আন্দোলনের ফলে ফ্যাসিস্ট শাসকেরা বিদায় নিয়েছে। একটা অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হয়েছে। তাদের কাছে জনগণের প্রত্যাশা রাষ্ট্র মেরামতের ন্যূনতম সংস্কার দ্রুত সম্পন্ন করে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ফিরে যাওয়ার জন্য সবার কাছে গ্রহণযোগ্য একটি নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্পন্ন করা।
খালেদা জিয়া আরও বলেন, বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষ, বিশেষ করে তরুণ সমাজ আজ এক ইতিবাচক গণতান্ত্রিক পরিবর্তনের জন্য উন্মুখ হয়ে আছে। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সংকীর্ণতা ভুলে দেশ ও জাতির বৃহত্তর স্বার্থে আমাদের কাজ করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, এখনো ফ্যাসিস্টদের দোসররা ও বাংলাদেশের শত্রুরা গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে প্রাপ্ত অর্জনকে নস্যাৎ করার জন্য গভীর চক্রান্তে লিপ্ত রয়েছে। ইস্পাত-কঠিন ঐক্যের মাধ্যমে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে এ চক্রান্তকে ব্যর্থ করে দিতে হবে। গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ বিনির্মাণের জন্য আমাদের সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে।
খালেদা জিয়া বলেন, আমি যুক্তরাজ্য থেকে অসুস্থ অবস্থায় আপনাদের আহ্বান জানাতে চাই- আসুন, জনগণকে সম্পৃক্ত করে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলকে পূর্বের ন্যায় আন্দোলন, সংগ্রাম ও রাষ্ট্র পরিচালনায় নেতৃত্ব প্রদানে আরও ঐক্যবদ্ধ ও সুসংহতভাবে গড়ে তুলি। দেশবাসীর উদ্দেশে খালেদা জিয়া বলেন, আসুন প্রতিহিংসা, প্রতিশোধ নয়, পারস্পরিক ভালোবাসা ও ভ্রাতৃত্বের মাধ্যমে আমরা সবাই মিলে আমাদের প্রিয় বাংলাদেশকে সত্যিকার অর্থেই একটি বাসযোগ্য, উন্নত ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পরিণত করি।
জাতীয় নির্বাচনের আগে স্থানীয় সরকার নির্বাচন করার সিদ্ধান্ত থেকে অন্তর্বর্তী সরকারকে সরে আসার আহ্বান জানিয়েছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তিনি বলেন, দেশের পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছে এখনো আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অন্তর্বর্তী সরকারের নিয়ন্ত্রণে আসেনি। জাতীয় নির্বাচনের আগে স্থানীয় সরকার নির্বাচন করে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে করা বলে জনগণ মনে করে।
গতকাল জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় দলের বর্ধিত সভায় উদ্বোধনী বক্তব্যে এ কথা বলেন তিনি।
তারেক রহমান বলেন, আমি অন্তর্বর্তী সরকারকে আহ্বান জানাই, জাতীয় নির্বাচনের আগে স্থানীয় সরকার নির্বাচন করার সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসুন। তারেক রহমান বলেন, বাংলাদেশের গণতন্ত্রকামী জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা প্রতীক বিএনপির বর্ধিত সভা দীর্ঘ ৭ বছর পর অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এর আগে বিএনপির সর্বশেষ বর্ধিত সভা অনুষ্ঠিত হয়েছিল ২০১৮ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি। সেই অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন মাদার অব ডেমোক্রেসি বেগম খালেদা জিয়া। ফ্যাসিবাদী শাসনকালে এরপর আর বিএনপির বর্ধিত সভা কিংবা কাউন্সিল অনুষ্ঠান সম্ভব হয়নি।
চিকিৎসাধীন থাকায় খালেদা জিয়া আজকের (বৃহস্পতিবার) এই গুরুত্বপূর্ণ সভায় উপস্থিত থাকতে পারেননি বলে উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, তবে তিনি এই সভার সাফল্য কামনা করেছেন। তিনি আপনাদের কাছে দোয়া চেয়েছেন। দেশনেত্রীর শারীরিক সুস্থতার জন্য আমরা আল্লাহর দরবারে দোয়া কামনা করছি। মাদার অব ডেমোক্রেসি বেগম খালেদা জিয়ার সম্মোহনী ব্যক্তিত্ব আর সুদক্ষ নেতৃত্ব বিএনপিকে পৌঁছে দিয়েছিল সারা দেশের প্রতিটি গ্রামে প্রতিটি ঘরে।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান বলেন, বৃহস্পতিবারের এই বর্ধিত সভার শুরুতেই আমি বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানকে স্মরণ করতে চাই। তিনি একদলীয় অভিশপ্ত বাকশালের অন্ধকারাচ্ছন্ন বাংলাদেশে গণতন্ত্রের আলো জ্বালিয়েছিলেন। জনগণের ভালোবাসায় ধন্য বিএনপির হাতে গণতন্ত্রের পতাকা তুলে দিয়েছিলেন।
তিনি বলেন, সর্বোপরি ’৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের লাখো শহীদ দেশে গণতন্ত্র ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার দীর্ঘ ধারাবাহিক সংগ্রামে যারা শহীদ হয়েছেন, ২০২৪ সালে জুলাই-আগস্টে তাঁবেদার অপশক্তির বিরুদ্ধে দলমত নির্বিশেষে স্বাধীনতা রক্ষার যুদ্ধের সাহসী বীর আবু সাইয়িদ, মুগ্ধ, ওয়াসিম রিয়া গোপ, আব্দুল আহাদ এবং বিএনপির পাঁচ শতাধিকসহ হাজারও শহীদ এবং আহত যোদ্ধাদের গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করছি।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান বলেন, টাকা পাচার আর লুটপাট চালিয়ে দেশের অর্থনীতি ভঙ্গুর করে দিয়েছিল। অকার্যকর করে দেয়া হয়েছিল দেশের সব সাংবিধানিক এবং বিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠান। জনগণের ভোটের অধিকার হরণ করে জনগণকে রাজনৈতিকভাবে ক্ষমতাহীন করে দিয়ে দেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্বকে বিপন্ন করে তুলেছিল।
তিনি বলেন, এমন পরিস্থিতিতে রাষ্ট্র সরকার এবং রাজনীতির গুণগত পরিবর্তনের লক্ষ্যে মাদার অফ ডেমোক্রেসি বেগম খালেদা জিয়া ২০১৭ সালে ভিশন ২০৩০ দিয়েছিলেন। এরই ধারাবাহিকতায় ২০২২ সালে বিএনপি ২৭ দফা কর্মসূচি ঘোষণা করে। পরবর্তীতে গণতন্ত্রের পক্ষের রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে মতবিনিময়ের পর ঘোষণা করা হয় ৩১ দফা কর্মসূচি। এই ৩১ দফা নিয়ে বর্তমানে বিএনপির উদ্যোগে সারা দেশে জনগণের সঙ্গে সংলাপ চলছে।
তারেক রহমান বলেন, রাষ্ট্র-সরকার-রাজনীতি এবং রাজনৈতিক দল মেরামতের জন্য দফা ৩১টি হলেও এর চূড়ান্ত লক্ষ্য একটি। সেটি হলো ‘একটি নিরাপদ গণতান্ত্রিক মানবিক বাংলাদেশ বিনির্মাণ। ঠিক তেমনি উদ্দেশ্যও একটি। সেটি হলো রাষ্ট্র ও সমাজে জনগণের রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করা’। এটি নিশ্চিত করা না গেলে স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব-গণতন্ত্র-নিরাপত্তা-সমৃদ্ধি কোনোটিই টেকসই হবে না।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান বলেন, রাষ্ট্র এবং সমাজে জনগণের রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করার পূর্ব শর্ত হলো প্রতিটি নাগরিকের ভোট প্রয়োগের অধিকার বাস্তবায়ন। এবং এ লক্ষ্যেই একটি রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপি বারবার জনগণের ভোটে জনগণের কাছে দায়বদ্ধ সরকার প্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্যেই জাতীয় নির্বাচনের দাবি জানায়।
তিনি বলেন, একজন রাজনৈতিক কর্মী আমি বিশ্বাস করি আজ এবং আগামী দিনের রাজনীতিতে বিএনপির এই ৩১ দফা হচ্ছে, একটি বৈষম্যহীন গণতান্ত্রিক মানবিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার সনদ। তবে এই ৩১ দফাই শেষ কথা নয় সময়ের প্রয়োজনে রাষ্ট্র সরকার- রাজনীতি ও রাজনৈতিক দলের সংস্কারের জন্য এই ৩১ দফায়ও সংযোজন-বিযোজনের সুযোগ রয়েছে। এমনকি বিএনপির ৩১ দফার সঙ্গে বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সংস্কার প্রস্তাবনার খুব বেশি ইস্যুতে মৌলিক বিরোধ নেই।
তারেক রহমান বলেন, বিভিন্ন সময়ে ‘জাতীয় নির্বাচন’ নিয়ে প্রধান উপদেষ্টার বক্তব্য জনমনে ইতিবাচক ধারণা সৃষ্টি করলেও ‘জাতীয় নির্বাচন’ নিয়ে কোনো কোনো উপদেষ্টার বিভ্রান্তিমূলক বক্তব্য মন্তব্য স্বাধীনতাপ্রিয় গণতন্ত্রকামী জনগণের জন্য হতাশার কারণ হয়ে উঠছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রতি বিএনপিসহ গণতন্ত্রের পক্ষের সব রাজনৈতিক দলের নিঃশর্ত সমর্থন থাকলেও সরকার এখনো তাদের কর্মপরিকল্পনায় অগ্রাধিকার নির্ধারণ করতে পারছে না।
তিনি আরও বলেন, সারা দেশে খুন, হত্যা, ধর্ষণ, চুরি, ছিনতাই, রাহাজানি বেড়েই চলেছে। বাজার সিন্ডিকেটের কবলে পড়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণহীন। বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এখনো দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। সরকার যেখানে দেশের বাজার পরিস্থিতি কিংবা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কাঙ্ক্ষিত সফলতা অর্জন করতে পারছে না সেখানে জাতীয় নির্বাচনের আগে ‘স্থানীয় নির্বাচন’ অনুষ্ঠানের নামে কেন দেশের পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে করতে চাইছে এটি জনগণের কাছে বোধগম্য নয়।
জনগণ মনে করে স্থানীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে সেটি হবে সারা দেশে পলাতক স্বৈরাচারের দোসরদের পুনর্বাসনের একটি প্রক্রিয়া যা সরাসরি গণ-অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা বিরোধী বলে উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, গণহত্যাকারী টাকা পাচারকারী দুর্নীতিবাজ মাফিয়া চক্রকে পুনর্বাসন প্রক্রিয়ার এই ফাঁদে বিএনপি পা দেবে না। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান বলেন, বিএনপি জনগণের কাছে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, আগামী জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি জন রায়ে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পেলে গণহত্যাকারী-মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচারের মুখোমুখি করবে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রতি আহ্বান, সারা দেশে গণহত্যাকারীদের দোসর মাফিয়া চক্রকে পুনর্বাসনের ‘স্থানীয় নির্বাচন’ অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা থেকে সরে আসুন। অবিলম্বে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আগামী দিনের সুনির্দিষ্ট ‘কর্ম পরিকল্পনার রোডম্যাপ’ ঘোষণা করুন।
মাফিয়া প্রধান হাসিনা দেশ ছেড়ে পালানোর পর এ পর্যন্ত ১৬/১৭টি নতুন রাজনৈতিক দলের আত্মপ্রকাশ ঘটেছে বলে উল্লেখ করে তারেক রহমান আরও বলেন, বহুদলীয় গণতন্ত্রে বিশ্বাসী বিএনপি সব নতুন রাজনৈতিক দল ও সংগঠনকে স্বাগত জানায়। তবে নির্বাচনের মাধ্যমে গ্রহণ কিংবা বর্জনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানাবে জনগণ। সুতরাং প্রতিটি দলের অংশগ্রহণে একটি অবাধ ও সুষ্ঠু ‘জাতীয় নির্বাচন’ অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে সবার আগে নির্বাচন কমিশনকে প্রস্তুত রাখতে হবে।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান বলেন, দেশে একটি অবাধ এবং সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য নিরপেক্ষতাই হচ্ছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সবচেয়ে বড় পুঁজি। কিন্তু সরকারের নিরপেক্ষতা নিয়ে ইতোমধ্যেই জনমনে সন্দেহ সংশয়ের সৃষ্টি হয়েছে। নিজেদের নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে আমি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রতি আরও সতর্কতা অবলম্বনের আহ্বান জানাই।
বাইরে থেকে ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা এবং দেশের ভেতর থেকে একটি পক্ষ গণতন্ত্রকে বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ করেছেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
গতকাল জাতীয় সংসদ ভবনের এলডি হল প্রাঙ্গণে আয়োজিত দলের বর্ধিত সভায় দেয়া স্বাগত বক্তব্যে তিনি এ অভিযোগ করেন।
মির্জা ফখরুল বলেন, ‘পালিয়ে যাওয়া শেখ হাসিনা দেশের বাইরে থেকে এবং দেশের ভেতর থেকে একটা পক্ষ প্রতিনিয়ত গণতন্ত্র বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা করছে। তারা অখণ্ড বাংলার বিখ্যাত মনীষীদের নামে থাকা স্থাপনাগুলো থেকে তাদের নাম সরিয়ে বিতর্কিত ব্যক্তিদের নামে নামকরণের কথা বলে একটা অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা করছে। এ বিষয়ে আমাদের সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।’
মির্জা ফখরুল বলেন, ‘বর্ধিত সভার পর তারেক রহমানের নেতৃত্বে সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডগুলো গুরুত্বের সঙ্গে করব। খালেদা জিয়া কারাগারে যাওয়ার পর দক্ষতার সঙ্গে আমাদের নেতৃত্ব দিয়েছেন। ডান-বামকে এক জায়গায় এনে ৩১ দফা দিয়েছেন।’
বিএনপির নিরন্তর সংগ্রামের কারণে শেখ হাসিনা পালিয়ে যেতে বাধ্য হয় মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘আপনারা দেখেছেন কী পরিমাণ ত্যাগের বিনিময়ে বিএনপির মতো একটি লিবারেল ডেমোক্রেটিক দল নিরন্তর সংগ্রাম চালিয়ে গেছে। এরই ফলশ্রুতিতে দেশ থেকে ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়।’
তিনি বলেন, ‘শেখ হাসিনার পতনের পর দেশের মানুষ আশা করেছিল অতি দ্রুত তারা ভোট দিতে পারবেন, তাদের কাঙ্ক্ষিত গণতন্ত্র ফিরে পাবেন। কিন্তু এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো উদ্যোগ আমরা দেখতে পারছি না। আমরা ফ্যাসিবাদ তাড়িয়েছি গণতন্ত্র ফিরে পাওয়ার জন্য। কিন্তু সেটা এখনো নিশ্চিত হয়নি। অথচ এজন্য আমরা অনেক ত্যাগ স্বীকার করেছি।’
প্রসঙ্গত, দীর্ঘ সাত বছর পর অনুষ্ঠিত হলো বাংলাদেশ জাতীয়বাদী দলের (বিএনপি) বর্ধিত সভা। সারা দেশ থেকে আসা প্রতিনিধিদের মাঝে ছিল ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা।
সারা দেশ থেকে আসা প্রায় চার হাজার প্রতিনিধি এতে অংশ নিয়েছেন। গতকাল জাতীয় সংসদ ভবনের এলডি হল ও মাঠ প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত শুরু হয়, শেষ হয় সন্ধ্যায়। পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী, সকাল ১০টা থেকে বর্ধিত সভা শুরু হয়। সে অনুযায়ী, সকাল সাড়ে ৯টা থেকেই আমন্ত্রিত নেতারা এলডি হলসংলগ্ন মাঠে আসা শুরু করেন।
অনুষ্ঠানের শুরুতে পবিত্র কোরআন তিলাওয়াতের পর গত ১৬ বছরে আন্দোলন সংগ্রামে নিহত দলের নেতা-কর্মীদের স্মরণে ১ মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। এরপর প্রয়াত ও গুম হওয়া নেতা-কর্মীদের জন্য শোকপ্রস্তাব পাঠ করা হয়। শোকপ্রস্তাব পাঠ করেন বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী।
সভার মূল মঞ্চে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন, মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, আবদুল মঈন খান, নজরুল ইসলাম খান, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সালাহ উদ্দিন আহমদ, সেলিমা রহমান, ইকবাল হাসান মাহমুদ, মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দীন আহমেদসহ সিনিয়র নেতারা স্থান পেয়েছেন।