জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
মার্চ ২৮, ২০২৫, ১২:২০ এএম
জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
মার্চ ২৮, ২০২৫, ১২:২০ এএম
সমৃদ্ধ এশিয়া গড়তে দরকার সুস্পষ্ট রোডম্যাপ
রাশিয়া বাংলাদেশে আরও গম ও সার রপ্তানিতে আগ্রহী
চীনে কৃষিপণ্য রপ্তানিতে এফএও’র সহযোগিতা কামনা
ইউনূসের নেতৃত্বে বাংলাদেশ অনেক ভালো করবে— বললেন বান কি মুন
চার দিনের চীন সফরে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন বাংলাদেশ সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস। তিনি গতকাল চীনের হাইনানে বোয়াও ফোরাম ফর এশিয়া বার্ষিক সম্মেলনে ব্যস্ততম দিন কাটানোর পর স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৭টায় বেইজিংয়ের উদ্দেশে হাইনান ত্যাগ করেন।
চার দিনের চীন সফরের প্রথম দিনে গতকাল বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা বোয়াও ফোরাম ফর এশিয়া বার্ষিক সম্মেলনে বক্তব্য রাখেন এবং দ্বি-পক্ষীয় বৈঠকসহ অন্তত আটটি অনুষ্ঠানে অংশ নেন। আজ বেইজিংয়ে মুহাম্মদ ইউনূস ও চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিন পিংয়ের মধ্যে প্রথম দ্বি-পক্ষীয় বৈঠক হবে। বৈঠকে দ্বিপক্ষীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা হবে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে চীনের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে ইউনূসের বৈঠকের ওপর বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক ক্ষেত্রে দেশটির প্রতিদ্বন্দ্বী যুক্তরাষ্ট্র, ভারতসহ বিভিন্ন দেশের নজর থাকবে। এই সফর নিয়ে দুই দেশই উচ্ছ্বসিত। সম্পর্ক গভীর করতে আগ্রহী বাংলাদেশ ও চীন।
চীনে শীর্ষ পর্যায়ের এই বৈঠকের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রসচিব মো. জসীম উদ্দিন গত মঙ্গলবার ঢাকায় এক প্রেস ব্রিফিংয়ে বলেন, দুই পক্ষ থেকেই পানি ব্যবস্থাপনা বিষয়ে আলোচনায় আগ্রহ আছে। সেখানে তিস্তা নদীর পানি ব্যবস্থাপনা নিয়ে কথা বলারও সুযোগ আছে। ভারতের সঙ্গে অভিন্ন নদী তিস্তার পানি ভাগাভাগির বিষয়টি অমীমাংসিত থাকার প্রেক্ষাপটে এ নদীর বাংলাদেশ অংশের পানি ব্যবস্থাপনায় চীনের যুক্ত হওয়ার আগ্রহের বিষয়েও প্রশ্ন আছে বিভিন্ন মহলে। এর বাইরে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া মিয়ানমারের রোহিঙ্গা সমপ্রদায়ের প্রায় ১১ লাখ নাগরিককে রাখাইনে ফেরত পাঠানো, বাংলাদেশে চীনের বিশেষায়িত হাসপাতাল প্রতিষ্ঠাসহ স্বাস্থ্য খাতে সহযোগিতা বাড়ানো, মানবসম্পদ উন্নয়ন, অর্থনৈতিক ও কারিগরি সহযোগিতা, সংস্কৃতি, ক্রীড়া ও গণমাধ্যমের ক্ষেত্রে সহায়তা দেওয়ার বিষয়ে দুই নেতার মধ্যে আলোচনা হবে। যুক্তরাষ্ট্রসচিবের তথ্য অনুযায়ী, এসব বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে কয়েকটি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক সই হবে। বাংলাদেশকে ঋণ ও অনুদান সহায়তা, বিনিয়োগ চুক্তি নিয়ে আলোচনা শুরু করা, অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠা ও স্বাস্থ্য খাতে সহায়তার বিষয়ে একাধিক বড় ঘোষণা আসতে পারে।
সমৃদ্ধ এশিয়া গড়তে দরকার সুস্পষ্ট রোডম্যাপ
বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস এশীয় দেশগুলোকে উজ্জ্বল ভবিষ্যত ও যৌথ সমৃদ্ধির জন্য একটি সুস্পষ্ট রোডম্যাপ তৈরির আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি গতকাল চীনের হাইনানে বোয়াও ফোরাম ফর এশিয়া (বিএফএ) সম্মেলনে দেয়া বক্তব্যে এ আহ্বান জানান। অধ্যাপক ইউনূস বলেন, ‘পরিবর্তনশীল এই বিশ্বে এশীয় দেশগুলোর ভাগ্য পরস্পরের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। আমাদের অবশ্যই একটি স্পষ্ট রোডম্যাপ তৈরি করতে হবে যা অভিন্ন ভবিষ্যত এবং যৌথ সমৃদ্ধির দিকে নিয়ে যাবে।’
আর্থিক সহযোগিতা প্রসঙ্গে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, এশিয়াকে অবশ্যই একটি টেকসই অর্থায়ন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে এবং আঞ্চলিক উন্নয়ন ব্যাংক (এমডিবি) ও অনুরূপ প্রতিষ্ঠানগুলোর এই প্রচেষ্টায় নেতৃত্ব দেওয়া উচিত। তিনি বলেন, ‘আমাদের এমন নির্ভরযোগ্য তহবিল দরকার যা আমাদের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা ও ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণ করবে।’ বাণিজ্য সহযোগিতা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এশিয়া এখনো বিশ্বের অন্যতম কম সংযুক্ত অঞ্চল। অধ্যাপক ইউনূস বলেন, ‘এই দুর্বল সংযুক্তি বিনিয়োগ ও বাণিজ্যকে বাধাগ্রস্ত করছে। আমাদের অবশ্যই বাণিজ্য সহযোগিতা বাড়ানোর জন্য দ্রুত কাজ করতে হবে।’
খাদ্য ও কৃষি সহযোগিতা বিষয়ে অধ্যাপক ইউনূস বলেন, এশীয় দেশগুলোকে অবশ্যই সম্পদ-সাশ্রয়ী কৃষিকে উৎসাহিত এবং খাদ্য নিরাপত্তার জন্য স্থানীয় উৎপাদন বাড়াতে হবে। তিনি বলেন, ‘আমাদের আমদানির ওপর নির্ভরতা কমাতে হবে। স্বনির্ভরতা অর্জন করতে হবে। টেকসই প্রযুক্তিভিত্তিক কৃষি সমাধান ও জলবায়ু-বান্ধব চাষাবাদের ক্ষেত্রে উদ্ভাবন বাড়ানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’
প্রধান উপদেষ্টা আরও বলেন, এশিয়াকে অবশ্যই একটি শক্তিশালী প্রযুক্তি ইকোসিস্টেম গড়ে তুলতে হবে, যা পুনর্গঠনমূলক, সমবণ্টনমূলক এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক হবে।
তিনি বলেন, ‘আমাদের জ্ঞান, তথ্য ভাগ করে নিতে হবে এবং প্রযুক্তি ইনকিউবেশন ও উদ্ভাবনে বিনিয়োগ করতে হবে। ডিজিটাল সমাধানে সহযোগিতা আমাদের অগ্রগতিকে ত্বরান্বিত করবে।’ প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘পরিশেষে বলব আমাদের সম্মিলিত কর্মকাণ্ডে কেন্দ্রে মেধা সম্পদ ও যুবশক্তিকে রাখতে হবে।’
তিনি বলেন, ‘আমাদের অবশ্যই একটি নতুন সভ্যতার ভিত্তি স্থাপন করতে হবে- একটি আত্মরক্ষা ও আত্মস্থায়ী সমাজ। আমাদের শূন্য-বর্জ্যের জীবনধারার ওপর ভিত্তি করে একটি পাল্টা সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। ভোগ সীমিত রাখতে হবে মৌলিক প্রয়োজনের মধ্যে। আমাদের অর্থনীতিকে সামাজিক ব্যবসার ওপর ভিত্তি করে গড়ে তুলতে হবে, যা ভবিষ্যতের ব্যবসায়িক কাঠামো হিসেবে উদ্ভাসিত হবে, যেখানে উদ্ভাবন, লক্ষ্য ও দায়িত্ববোধ একীভূত থাকবে।’ অধ্যাপক ইউনূস আরও বলেন, বোয়াও ফোরাম ও অন্যান্য অনুরূপ উদ্যোগগুলোকে যুবসমাজ ও উদ্যোক্তাদের মধ্যে সহযোগিতা বৃদ্ধিতে সহায়তা করতে হবে, যেন আগামী প্রজন্মের জন্য এশিয়াকে আরও উন্নত করা যায়।
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘প্রত্যেক যুবককে তিন-শূন্য নীতিতে গড়ে উঠতে হবে: শূন্য কার্বন নির্গমন, শূন্য সম্পদের কেন্দ্রীকরণ এবং সামাজিক ব্যবসার মাধ্যমে শূন্য বেকারত্ব।’ এ সময়ে ইউনূস সকলের জন্য সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে এশিয়ার দেশগুলোকে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানান।
বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক হবে আরও গভীর
বাংলাদেশ ও চীন তাদের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও গভীর করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। চীন বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারকে পূর্ণ সমর্থন দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। দ্বিপক্ষীয় কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার ৫০ বছর পূর্তিতে উভয় দেশ বিনিয়োগ, বাণিজ্য ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক এবং জনগণের মধ্যে পারস্পরিক বিনিময় বৃদ্ধিতেও একমত হয়েছে। চীনের উপপ্রধানমন্ত্রী ডিং শুয়েশিয়াং গতকাল বৃহস্পতিবার হাইনানের উপকূলীয় শহরে বোয়াও ফোরাম ফর এশিয়া বার্ষিক সম্মেলনের ফাঁকে বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে বৈঠক করেন এবং পরে দুই দেশের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়।
উপ-প্রধানমন্ত্রী ডিং বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট শি জিন পিং আপনার সফরকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচনা করছেন।’ তিনি আরও বলেন, চীন আশা করে, প্রফেসর ইউনূসের নেতৃত্বে বাংলাদেশ সমৃদ্ধি অর্জন করবে। বৈঠকে প্রধান উপদেষ্টা বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ওয়ান-চায়না নীতি মেনে চলার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেন এবং বলেন, চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভে যোগ দেয়া প্রথম দক্ষিণ এশীয় দেশ হিসেবে ঢাকা গর্ব অনুভব করে। বৈঠকে বাংলাদেশ বিভিন্ন উন্নয়ন ও জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন প্রকল্পে চীনের সহায়তা চেয়েছে এবং চীনা ঋণের সুদের হার ৩ শতাংশ থেকে ১-২ শতাংশে নামিয়ে আনার অনুরোধ করে। এছাড়া, বাংলাদেশ চীনা অর্থায়নে পরিচালিত প্রকল্পগুলোর কমিটমেন্ট ফি মওকুফের আহ্বান জানিয়েছে।
প্রধান উপদেষ্টা চীনের তৈরি পোশাক কারখানা, বৈদ্যুতিক যানবাহন, হালকা যন্ত্রপাতি, উচ্চ প্রযুক্তির ইলেকট্রনিকস, চিপ উৎপাদন এবং সৌর প্যানেল শিল্প বাংলাদেশে স্থানান্তর সহজ করতে বেইজিংয়ের সহায়তা চান। উপপ্রধানমন্ত্রী ডিং শুয়েশিয়াং জানান, ২০২৮ সাল পর্যন্ত চীনে বাংলাদেশি পণ্য শুল্কমুক্ত ও কোটামুক্ত প্রবেশাধিকার পাবে, যা বাংলাদেশের স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে মধ্যম আয়ের দেশে উত্তরণের দুই বছর পর পর্যন্ত বহাল থাকবে। তিনি আরও জানান, চীন বাংলাদেশের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য আলোচনা শুরু করতে আগ্রহী।
উপপ্রধানমন্ত্রী বলেন, তাঁর দেশ মোংলা বন্দরের আধুনিকায়ন এবং দাশেরকান্দি পয়ঃনিষ্কাশন প্রকল্পের উন্নয়নেও অর্থায়ন করবে। তিনি উল্লেখ করেন, গত বছর চীন বাংলাদেশ থেকে আম রপ্তানির জন্য একটি প্রোটোকল স্বাক্ষর করেছে। এ বছরের গ্রীষ্মকাল থেকেই বাংলাদেশ থেকে চীনে আম রপ্তানি শুরু হবে। বেইজিং কাঁঠাল, পেয়ারা এবং অন্যান্য ফলজ পণ্য আমদানি করতেও আগ্রহী, যাতে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য ভারসাম্যের বিশাল ব্যবধান কমানো যায়।
চীনা সরকার ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের আরও বেশি স্কলারশিপ প্রদান করবে, উল্লেখ করে তিনি বলেন, ইতোমধ্যেই হাজার হাজার বাংলাদেশি শিক্ষার্থী চীনের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছে। উপপ্রধানমন্ত্রী ঢাকার রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বাংলাদেশ শিপিং কর্পোরেশনের জন্য চারটি সমুদ্রগামী জাহাজ ক্রয়ের ক্ষেত্রে চীনের অর্থায়নের আশ্বাস দেন। তিনি বলেন, রোহিঙ্গা সংকট সমাধানের প্রচেষ্টায় চীন বাংলাদেশ ও মিয়ানমারকে নিয়ে সংলাপ করবে। প্রফেসর ইউনূস চীনের নেতৃত্বের সমর্থনের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেন, বৃহস্পতিবারের এই বৈঠক ‘ক্রমবর্ধমান বাংলাদেশ-চীন অংশীদারিত্বের আরেকটি মাইলফলক চিহ্নিত করল।’ তিনি বলেন, ‘আসুন, আমরা একসঙ্গে কাজ করার সংকল্প গ্রহণ করি যাতে আমাদের দুই দেশের মধ্যে কৌশলগত সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় হয় এবং বন্ধুত্ব, সহযোগিতা ও পারস্পরিক অংশীদারিত্বের একটি নতুন যুগের সূচনা হয়।’
রাশিয়া বাংলাদেশে আরও গম ও সার রপ্তানিতে আগ্রহী
রাশিয়া বাংলাদেশে আরও বেশি গম ও সার রপ্তানি করতে আগ্রহী। রাশিয়ার উপ-প্রধানমন্ত্রী আলেক্সেই ওভারচুক গতকাল বৃহস্পতিবার চীনের হাইনান প্রদেশের বোয়াও শহরে বোয়াও ফোরাম ফর এশিয়া সম্মেলনের ফাঁকে বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে বৈঠকে বলেন, ‘রাশিয়া বাংলাদেশে আরও গম ও সার রপ্তানি করতে চায়।’ বৈঠকে দুই নেতা পারস্পরিক স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন, যার মধ্যে রয়েছে- রাশিয়ার অর্থায়নে নির্মিত রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের কার্যক্রম, রাশিয়া থেকে বাংলাদেশে গম ও সার আমদানির পরিকল্পনা এবং গ্যাজপ্রমের গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রম। অধ্যাপক ইউনূস বলেন, রূপপুর বিদ্যুৎ কেন্দ্রের অর্থ সংক্রান্ত বিষয়গুলো সমাধান হয়েছে এবং বাংলাদেশ ঢাকায় একটি অ্যাকাউন্টে অর্থ পরিশোধ করছে। তিনি জানান, রূপপুর বিদ্যুৎ কেন্দ্র এ বছরের শেষের দিকে পরীক্ষামূলকভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু করতে পারে।
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, বাংলাদেশ রাশিয়া থেকে আরও বেশি গম ও সার আমদানি করবে। তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ রাশিয়ার বৃহৎ জ্বালানি সংস্থা গ্যাজপ্রমকে দেশটির অফ শোর ও অন শোরে আরও অনুসন্ধান কার্যক্রম দেখতে আগ্রহী। আলেক্সেই ওভারচুক দুই দেশের জনগণের মধ্যে সম্পর্ক বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করে বলেন, আরও বেশি বাংলাদেশি শিক্ষার্থী রাশিয়ায় পড়াশোনা করতে যাক, সেটি আমরা দেখতে চাই।
চীনে কৃষিপণ্য রপ্তানিতে এফএও’র সহযোগিতা কামনা
বাংলাদেশ থেকে চীনে বৃহৎ পরিসরে ফল ও কৃষিপণ্য রপ্তানিতে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও)-এর সহযোগিতা চেয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস।
গতকাল বৃহস্পতিবার চীনের হাইনানে বোয়াও ফোরাম ফর এশিয়ার (বিএফএ) বার্ষিক সম্মেলনের ফাঁকে এফএও’র মহাপরিচালক কু ডংইউর সঙ্গে এক বৈঠকে প্রধান উপদেষ্টা এই সহযোগিতা কামনা করেন। অধ্যাপক ইউনূস বলেন, চীন কৃষি ও ফলজ পণ্যের শীর্ষ আমদানিকারক হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে, কিন্তু চীনের বাজার সম্পর্কে না জানার কারণে বাংলাদেশ সেখানে প্রবেশ করতে পারছে না। ফাও-এর মহাপরিচালক কিউ দংইউ এক সময় চীনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ছিলেন। প্রধান উপদেষ্টা তাকে চীনা আমদানিকারক ও বাংলাদেশের কৃষি ও ফল উৎপাদনকারীদের মধ্যে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করার আহ্বান জানান। ফাও-এর মহাপরিচালকে উদ্দেশে করে অধ্যাপক ইউনূস বলেন, ফল প্রক্রিয়াজাতকরণ, সবজি সংরক্ষণ, গুদামজাতকরণ ও প্যাকেজিংয়ের ক্ষেত্রে আমাদের সহায়তা প্রয়োজন। আপনি আমাদের কৃষক ও রপ্তানিকারকদের সঙ্গে চীনকে সংযুক্ত করতে পারেন।
তিনি বলেন, চীন শিগগিরই বাংলাদেশ থেকে আম আমদানি করবে এবং ফাও-এর সহায়তায় বাংলাদেশ সহজেই আরও রপ্তানিযোগ্য শাকসবজি ও ফল উৎপাদন করতে পারবে। বাংলাদেশকে সহায়তার আশ্বাস দিয়ে ফাও-এর মহাপরিচালক বলেন, তার সংস্থা চীনে বাংলাদেশের কৃষিপণ্য রপ্তানির লক্ষ্যে একটি নতুন প্রকল্প গ্রহণ করবে। কিউ দংইউ বলেন, ‘আমরা মধ্যস্থতাকারী। আমরা বাংলাদেশি ও চীনা কৃষি কোম্পানিগুলোর মধ্যে একটি নতুন নেটওয়ার্ক স্থাপন করব।’ তিনি বলেন, বাংলাদেশ ফাও-এর সহায়তা গ্রহণকারী একটি বৃহত্তম দেশ। অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে বাংলাদেশ ভালো করবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। তিনি প্রধান উপদেষ্টাকে বলেন, ‘আপনি আমার বড় ভাই। আমি আন্তরিকভাবে আশা করি, আপনার দেশ ভালো করবে। আমরা অবশ্যই আপনাকে সহায়তা করব।’
ইউনূসের নেতৃত্বে বাংলাদেশ ভালো করবে, বললেন বান কি মুন
বাংলাদেশে একটি সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক উত্তরণের জন্য সাবেক জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুনের সহায়তা ও পরামর্শ কামনা করেছেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনুস। এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়। গতকাল বিওআও ফোরাম এশিয়া বার্ষিক সম্মেলনের সময় চীনের হাইনানে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে প্রধান উপদেষ্টা বান কি মুনকে বলেন, আমরা নতুনভাবে শুরু করতে চাই; আমরা আপনার সহায়তা ও পরামর্শ চাই। আমাদের এখন একটি দারুণ সুযোগ রয়েছে।
বান কি মুন অধ্যাপক ইউনূসের নেতৃত্বের প্রশংসা করে বলেন, আপনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ অনেক ভালো করবে। তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ এখন এমন এক নেতা পেয়েছে যিনি বিশ্বব্যাপী সম্মানিত। সাবেক জাতিসংঘ মহাসচিব তার স্মৃতিচারণ করেন, যখন তিনি এক তরুণ কূটনীতিক হিসেবে দিল্লিতে কর্মরত ছিলেন এবং তখন তিনি বাংলাদেশ ও দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রেখেছিলেন।
তিনি বলেন, এটাই আমার কলম ছিল যা বাংলাদেশ এবং কোরিয়ার মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার চুক্তি সই করেছিল। ব্যাংক কি মুন মন্তব্য করেন, বাংলাদেশ অনেক অগ্রগতি অর্জন করেছে, তবে রাজনৈতিক এবং গণতান্ত্রিক ক্ষেত্রে আরও ভালো করতে পারত।
অধ্যাপক ইউনূস বলেন, এক সময় বাংলাদেশ এবং কোরিয়া ছিল সমান অবস্থানে, কিন্তু এখন কোরিয়া অনেক এগিয়ে গেছে। বাংলাদেশের মানুষ অসাধারণ, কিন্তু রাজনৈতিক নেতৃত্ব আমাদের ধ্বংস করেছে। বান কি মুন আরও বলেন, তিনি বাংলাদেশকে কিহাক সং, ইয়াংওয়ান কর্পোরেশনের চেয়ারম্যান এবং কোরিয়ার অন্যতম শ্রদ্ধেয় ব্যবসায়ী নেতা, এর সাথে পরিচয় করিয়ে দেন, যিনি পরে বাংলাদেশে একটি বিশেষায়িত অর্থনৈতিক অঞ্চলে তার ব্যবসা সমপ্রসারণ করেছিলেন। প্রধান উপদেষ্টা জানান, সমপ্রতি বাংলাদেশ চট্টগ্রামের কোরীয় ইপিজেডের সাথে একটি দীর্ঘদিনের জমি সমস্যার সমাধান করেছে, যা আরও কোরীয় ব্যবসায়ীকে বাংলাদেশে বিনিয়োগে উৎসাহিত করবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। বাংলাদেশ বিনিয়োগ কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান আশিক মাহমুদ বৈঠকে জানান, কিহাক সং আগামী ঢাকা বিজনেস সামিটে কোরিয়া থেকে ২৬ সদস্যের একটি ব্যবসায়িক প্রতিনিধি দল নিয়ে আসবেন। রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে প্রধান উপদেষ্টা বান কি মুনের সহায়তা কামনা করেন এবং তাকে বাংলাদেশের একটি সুবিধাজনক সময়ে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানান।
প্রসঙ্গত, চার দিনের সরকারি সফরে গত ২৬ মার্চ বুধবার চীনে পৌঁছেছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। তাঁকে নিতে চীন সরকারের পাঠানো চায়না সাউদার্ন এয়ারলাইনসের একটি বিশেষ ফ্লাইট বাংলাদেশ সময় ওইদিন বিকাল সোয়া ৪টায় হাইনানের কিউনহায় বোয়াও আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে। হাইনান প্রদেশের ভাইস গভর্নর লিউ দেং শেন এবং চীনে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মো. নাজমুল ইসলাম বিমানবন্দরে প্রধান উপদেষ্টাকে অভ্যর্থনা জানান। গত বছরের ৮ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকারপ্রধানের দায়িত্ব গ্রহণের পর এটি অধ্যাপক ইউনূসের প্রথম দ্বিপক্ষীয় সফর। গত জুলাইয়ে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা (৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত) একই স্থানে চীনা নেতার সঙ্গে বৈঠক করেন। ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করে ভারতে চলে যান। ৮ আগস্ট ড. ইউনূস অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব নেন। প্রধান উপদেষ্টার ২৯ মার্চ দেশে ফেরার কথা রয়েছে।